অধিনস্তদের প্রতি নামাজের সচেতনতা

 


নামাজ এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয ইবাদাত, যে ইবাদাতকে হালকাভাবে দেখার কোনই সুযোগ নেই। এই ইবাদতই বান্দাকে তার রবের কাছাকাছি নিয়ে দাঁড় করায়, রবের সাথে বান্দার মজবুত এক কানেকশন তৈরি করে দেয়। রবের কাছে প্রিয় হয়ে উঠার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যমই হচ্ছে নামাজ। কিন্তু খুবই দুঃখজনকভাবে, আজকাল আমাদের মুসলিম সমাজের অনেক মানুষ আছেন যারা নিজেরা নামাজ আদায় করলেও তাদের ছেলেমেয়েদের নামাজের ব্যাপারে থাকেন চরম উদাসীন। নিজের সন্তানেরা ঠিকমতো নামাজ আদায় করলো কি-না এসব নিয়ে যেনো তাদের কোনো চিন্তা নেই, নেই ঐরকম কোনো মাথাব্যথা।


যদি সত্যিসত্যি নামাজের বিষয় তাদের চিন্তার কারণ হতো তবে এ বিষয় নিয়ে তারা তাদের সন্তানদেরকে কোনোভাবেই ছাড় দিতেন না বরং যেভাবেই হোক চাপ প্রয়োগ করে হলেও তাদেরকে বাধ্য করতেন। কারণ এখানে জাহান্নামের মতো ভয়ঙ্কর একটি বিষয় জড়িয়ে আছে। ফলে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।


অবশ্য, যেসব পরিবারে সন্তানদেরকে আল্লাহর হুকুুম পালনের আদেশ দেওয়া হয় তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলস্যস্বরে বলা হয় এবং তা অনেকটা দায়সারার জন্যই করা হয়ে থাকে। ফলে সন্তানেরাও আর প্রকৃত অর্থে নামাজমুখী হয়ে উঠে না, যেমন ছিল তেমনি রয়ে যায়।


আল্লাহ তা'য়ালার নিকট নামাজের গুরুত্ব এতোটাই বেশি যে, তিনি পরিবারের সদস্যদের নামাজের তৎপরতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার পরিবার পরিজনকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং তুমি তার ওপর অবিচল থাকো।’ [১]


এই আয়াতে স্পষ্টভাবে পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের তথা অধীনস্থদের নামাজের ব্যাপারে সজাগ থাকার পাশাপাশি তাতে অবিচল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে সন্তানদেরকে কেবল নামাজের নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকলে হবে না। সবসময় বলতেই থাকতে হবে। বারবার বললেও শুনে না এমনটা বলারও কোনো সুযোগ নেই। কেননা আল্লাহ তা'য়ালা নামাজের নির্দেশের প্রতি অটল থাকার কথা বলেছেন। সুতরাং প্রতিটি ওয়াক্তেই গুরুত্বের সাথে সন্তানদেরকে নামাজের নির্দেশ দিয়ে যেতে হবে।


সন্তানকে নামাজের সময় হলে আদরের স্বরে নামাজের আহবান করা উচিত। প্রথমেই ধমক দেওয়া, কড়া শাসন করা উচিত নয়। তাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। একেবারে ছোটোকাল থেকেই সাথে রেখে নামাজে অভ্যস্ত করা উচিত। সম্ভব হলে, নামাজ আদায় করলে আল্লাহর কেমন পুরস্কার পাওয়া যাবে তা তাদের নিকট তুলে ধরতে পারলে আরো ভালো হবে। তখন তাদের মধ্যে নামাজের আগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং নামাজের গুরুত্বও উপলব্ধি হবে। মাঝে মাঝে তাদেরকে নামাজ আদায়ের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সন্তানকে নামাজমুখী করার জন্য যতো ধরণের বৈধ পন্থা অবলম্বন করা যায় তার সবগুলোই যেন করা হয়।  


তবে হ্যাঁ, ভালোবাসা দিয়ে বোঝানোর পরও যদি সন্তান নামাজমুখী না হয়, গড়িমসি করতেই থাকে তবে নামাজের ব্যাপারে সন্তানের প্রতি এতোটাই কঠোর হওয়া উচিত যে, নামাজ আদায় না করলে খাবারই দেওয়া হবে না, তার কোনো আবদারই পূরণ করা হবে না। খাবার খেতে হলে তাকে আগে সময়মতো নামাজ আদায় করতেই হবে। আর এমন কঠোরতা সন্তানের ভালোর জন্যই। এমন কঠোর হয়েও যদি সন্তানকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানো যায় তবে এসব কঠোরতা সন্তানদের প্রতি যুলুম নয় বরং পরোক্ষভাবে এক ধরণের দয়া। 


আচ্ছা! চিন্তা করুন তো, আপনার সন্তানের রুমে যদি আগুন লাগে আর তখনো সে বিছানায় গড়াগড়ি করতে থাকে তবে কি আপনি তার গড়াগড়িকে পাত্তা দিয়ে তার নিজে থেকে উঠে আসার অপেক্ষায় থাকবেন নাকি রুমের দরজা ভেঙ্গে হলেও আপনি তাকে নিরাপদে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবেন?


নিশ্চয়ই আপনি জেনেশুনে তার অসচেতনতাকে পাত্তা দেবেন না, আপনি তখন তার গাফিলতির দিকে তাকাবেন না, যেভাবেই হোক তাকে নিরাপদে উদ্ধার করার জন্য ঝাপিঁয়ে পড়বেন। ঠিক একইভাবে, আপনার সন্তান নামাজের ব্যাপারে গাফেল থেকে ক্রমেই জাহান্নামের দিকে এগুচ্ছে। তাই বলে কি আপনি তার গাফিলতির দিকে তাকিয়ে বসে থাকবেন? ঐ আগুনের বিষয়ের মতো কি তার অসচেতনতাকে পাত্তা না দিয়ে তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন না? নিজের জায়গা থেকে নড়েচড়ে বসবেন না? যদি তা-ই হয় তাহলে কেন সন্তানদেরকে জোর করে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর প্রশ্নে নামাজমুখী করছেন না? কেন নামাজের ব্যাপারে নিজেদের সর্বোচ্চ তৎপরতা নিশ্চিত করছেন না?


[২]


দেখুন, আপনি আপনার সন্তানকে নিজে খেয়ে না খেয়ে সময়মতো খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, খেয়েছে কি-না খোঁজ নিচ্ছেন,অসুস্থ হলে ঔষধের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন ইত্যাদি যাবতীয় সবকিছু করে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব কেন করছেন? কারণ একটাই, আপনি আপনার আদরের সন্তানকে বাঁচাতে চান। আপনি চান না আপনার কলিজার টুকরা কষ্টে থাকুক। যেভাবেই হোক আপনি আপনার সন্তানের সুখ নিশ্চিত করতে চান।  


এখন আপনিই বলুন, যে অভিভাবক হয়ে আপনি আপনার সন্তানকে দুনিয়ার মতো অস্থায়ী জীবনে বাঁচাতে এতোকিছু করছেন সেই অভিভাবক কি তার কলিজার টুকরাকে আখিরাতের মতো স্থায়ী জীবনে বাঁচাতে চাইবে না? সেই অভিভাবক কি চাইবে না, যাকে ঘিরে তার সমস্ত ভালোবাসা সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে যাক?


যদি চান তবে আপনার সন্তানকে নামাজমুখী করে তাকে জাহান্নামের রাস্তা থেকে ফিরিয়ে রাখা কি আপনার দায়িত্ব নয়? আপনার সন্তান ঠিকমতো খাবার খেয়েছে কি-না গুরুত্বের সাথে সেটার খবর যেমন নিচ্ছেন ঠিক তেমনি সে আল্লাহর হক অর্থাৎ সময়মতো নামাজ আদায় করেছে কি-না তার খোঁজখবর নেওয়া কি আপনার উচিত নয়? আল্লাহর আদেশ নিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য আপনার সন্তানকে সিরিয়াসলি তাগিদ দেওয়া কি আপনার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না? সন্তানের কল্যাণার্থে আল্লাহর বিধান মেনে চলার জন্য তাদেরকে বাধ্য করা কি জরুরি নয়?


সন্তানদেরকে নামাজ আদায় করতে বাধ্য না করার কারণেই একসময় তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, হারাম রিলেশনশিপ, ডেটিং, গান-বাজনা, কনসার্ট, সিনেমা হলে যাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতে শুরু করে। এছাড়া, মা বাবার সাথে সন্তানদের দুর্ব্যবহার তো আছেই। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, “নিঃসন্দেহে নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে”। [২] 


এখন যে নামাজ হচ্ছে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখার উৎকৃষ্ট মেডিসিন সেই নামাজই যদি আদায় করা না হয়, সেই নামাজই যদি অনাদায় থেকে যায়, সেই নামাজ আদায়ের ব্যাপারে যদি উৎসাহ দেওয়া না হয় তবে কিভাবে সন্তানেরা অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকবে? কিভাবে তারা মন্দ কাজ থেকে নিজেকে হেফাজত করে চলবে, একটু ভেবে দেখবেন কি?


আল্লাহ তা'য়ালা তারা বান্দাদেরকে সর্তক করে বলেছেন, হে ঈমানদার ব্যক্তিরা!তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে সেই কঠিন আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাবের ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা'আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তা-ই করে। [২]


এই গুরুত্বপূর্ণ আয়াত বিশেষ করে প্রতিটি পরিবার কর্তাদের জন্য অনেক বড়ো একটি রিমাইন্ডার এবং সতর্কবার্তা বটে। আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, জাহান্নামে নিয়োজিত ফেরেশতারাও অত্যন্ত নিষ্ঠুর হবে। তাদের কোনো দয়া মায়া হবে না। তাই ছাড় পাবার কোনো সুযোগ থাকবে না। যেখানে আমরা মানুষের সামান্য একটু খারাপ আচরণই সহ্য করতে পারি না সেখানে ঐসব পাষাণ হৃদয়ের ফেরেশতাদের আচরণ সহ্য করতে পারবো তো?


এতোকিছু জানা সত্ত্বেও কি আমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার পরিজনদের নামাজ নিয়ে সচেতন হবো না? পরিবার পরিজনদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য কি নামাজমুখী তৎপরতা নিশ্চিত করবো না?


রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয় আল্লাহ তা’আলা তার থেকে নিজের জিম্মাদারী উঠিয়ে নেন’। [৩]


আল্লাহ জিম্মাদারী উঠিয়ে নিবেন-সে কি সাংঘাতিক কথা! আপনি কি চাইবেন না, আপনার এতো আদরের সন্তানেরা আল্লাহর জিম্মায় থাকুক? যদি চান তবে তাদেরকে নামাজমুখী করতে কিসের এতো গাফিলতি? আপনি কি সেই দূর্ভাগা হতে চান যে তার সন্তানকে নামাজমুখী করে আল্লাহর জিম্মায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলো না?


আসলে, মা-বাবারা কি সত্যিকার অর্থেই তাদের সন্তানদেরকে ভালোবাসেন-এমন প্রশ্ন শুনতে যতোটানা খারাপ শুনায় তার চেয়ে বেশি যৌক্তিক। কারণ কোনো মা-বাবা যদি তাদের সন্তানদেরকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবেসে থাকেন তবে কোনোক্রমেই তাদেরকে জাহান্নামের দিকে টেলে দিতে পারেন না, ক্রমেই জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে উঠে এমন কাজ করতে দিতে পারেন না।


এই যে সন্তানেরা দিনের পর দিন নামাজ ত্যাগ করে যাচ্ছে, ঠিকমতো সিয়াম পালন করছে না, মাহরাম, গায়রে-মাহরাম তথা পর্দা রক্ষা করে চলছে না, হারাম রিলেশনশিপে জড়িয়ে আছে সর্বোপরি আল্লাহর আদেশ নিষেধকে তোয়াক্কা করছে না তাতে কি তারা জাহান্নামের উপযুক্ত হচ্ছে না? জাহান্নামের পথে হাঁটছে না? মা-বাবা হিসেবে আপনারা কি তাদেরকে সেই ভয়াবহ পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারছেন? যদি তাদেরকে তা থেকে ফিরিয়ে রাখতে না পারেন তবে তাদের প্রতি আপনাদের কেমন ভালোবাসা থাকলো?


দেখুন, একজন মানুষকে আপনি তার সুখে-দুঃখে অনেক কিছুই দেন, অনেক সহায়তা করেন, অনেক কেয়ার করেন সর্বোপরি তাকে অনেক ভালোবাসেন কিন্তু তবুও একে প্রকৃত অর্থে ভালোবাসা বলে না। কেন জানেন? কারণ আপনার যে ভালোবাসা তাকে বিপথগামী হওয়া তথা জাহান্নামের পথ থেকে বাঁচাতে পারলো না সে ভালোবাসার আর কিই-বা মূল্য থাকলো? একজনের প্রতি আপনার প্রকৃত ভালোবাসা তখনই সার্থক হবে যখন আপনি তাকে জাহান্নামের কাজ করা থেকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্নক চেষ্টা অব্যহত রাখবেন।


সন্তানেরা বা অধীনস্থরা সময়মতো নামাজ আদায় করছে না, আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলছে না আর মা-বাবারাও তাদেরকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে বাধ্যও করছেন না তবে আপনারা তাদেরকে জাহান্নামের দিকেই তো টেলে দিচ্ছেন। এবার আপনারা নিজেদেরকেই জিজ্ঞেস করুন তো, আপনারা নিজেদের সন্তানদেরকে একদিকে জাহান্নামমুখী হয়ে চলতে দিয়ে অন্যদিকে তাদের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করলে প্রকৃত অর্থে সে ভালোবাসা প্রকাশের কি কোনো মানে থাকতে পারে যেখানে তাদেরকে জাহান্নাম থেকেই বাঁচানো গেলো না?


সেজন্যই বলি কোনো মা-বাবা তার সন্তানের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা মিটিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ভালোবাসি বললেই ভালোবাসা হয়ে যায় না। সন্তানকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারাতেই প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত।


সুতরাং আমাদের প্রত্যেক মা-বাবাদেরকে নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি সকল অধীনস্থদের প্রতিও নামাজসহ আল্লাহর অন্যান্য হুকুম পালন নিয়ে খেয়ালী হতে হবে। আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রত্যেককেই মৃত্যুর পর অধীনস্থের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ফলে কেবল নিজেরা আমল করতে থাকলে হবে না। অধীনস্থদের ব্যাপারেও পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে থাকতে হবে। তবেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হবে। 


রেফারেন্সঃ


[১] সূরা ত্বাহা, আয়াত নং : ১৩২

[২] সূরা আল আনকাবূত, আয়াত নং : ৪৫

[৩] সূরা আত তাহরীম, আয়াত নং : ০৬

[৪] সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ১৮, ইবনে মাজাহ : ৪০৩৪, মুসনাদে আহমদ : ২৭৩৬৪


রাকিব আলী 

Post a Comment

Previous Post Next Post